দুপচাঁচিয়ায় কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গুনাহারের জমিদার বাড়ী

প্রকাশিত: ৮:৫৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২৩

ফিরোজ হোসেন  : বগুড়া দুপচাঁচিয়া উপজেলার গুনাহারের খ্যাতিমান জমিদারের বিলাসবহুল বাড়ীটি আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ীটির নাম সাহেব বাড়ী। কেউ বলে খাঁন সাহেবের বাড়ী। যে যেই নামেই ডাকুক না কেন, এটাই হলো জমিদার বাড়ী। বাড়ীটি ধ্বংসস্তুপে পরিনত হতে চললেও জমিদারের কর্মযজ্ঞের স্মৃতি আজও মানুষের মুখে মুখে রয়েছে।

১১ জানুয়ারি  বুধবার সকালে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তরে গুনাহার গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন স্থানীয় মানুষসহ জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গুনাহারের এই জমিদার বা সাহেব বাড়ীটি খাঁন বাহাদুর মোতাহার হোসেন খানের। খাঁন বাহাদুর মোতাহার হোসেন খাঁন দুই পুত্র ও ৫ কন্যার জনক। তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার বিহার, উড়িৎষার এক্সসাইজ কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ছিলেন সৌখিন এবং সৌন্দর্যের পঞ্জারী জমিদার। তাইতো যখন এ দেশে একটি একতলা ভবন নির্মান করা ছিলো কোন অপ্রত্যাশিত স্বপ্ন পূরনের আশা। ঠিক সেই সময় ১৯৩৯ সালে তিনি গুনাহারের মতো নিভৃত পল্লীতে নির্মাণ করেন রাজপ্রসাদতুল্য দ্বিতল বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এবং বিলাসবহুল ভবন। ভবনের চতুরপাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিলো বিশাল নিরাপত্তা দিঘী। এ দিঘীতে জমিদার পরিবারের সদস্যরা বিকেলে নৌ-ভ্রমন করতেন। পাশাপাশি জমিদার বাড়ীর পশ্চিম পার্শ্বে বিশাল একটি ঘাট বাঁধানো দর্শনীয় পুকুর ছিলো। এই পুকুরেই জমিদার পরিবারের সদস্যরা গোসল করতো। পুকুরের পশ্চিম দক্ষিণে বিশাল উচু সীমানা প্রাচীর ছিলো যা আজও ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। বাড়ীর ভিতরের সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ করার নয়। যে সৌন্দর্যের কারনে বাড়ীটি দেখতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন অগনিত মানুষ ও পর্যটক। ১৯৫২ সালে ২ জুলাই তিনি নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন। তিনি জীবনদশায় নিজের পরিবার পরিজনদের চেয়ে প্রজাসাধারনের সুখের কথা বেশী ভাবতেন। আর সে কারনে তার মৃত্যুর পরও তার কর্মযজ্ঞের স্মৃতি আজও তাকে অমর করে রেখেছেন। বর্তমানে বাড়ীটি মোতাহার হোসেন খাঁন সাহেবের চতুর্থ ও ৫ম কন্যাদ্বয় চির কুমার রওশন মহল ও জৈলুশ মহলের নামে রেকর্ডকৃত এবং তারাই বিশেষ করে বগুড়া শহরে অবস্থানরত চিরকুমারী রওনক মহল বাড়ীটি নিজ দায়িত্বে দেখাশুনা ও সংস্কার কাজ সমাধান করে থাকেন। এই দিকে প্রায় ৩ যুগের ও বেশী সময় ধরে সংস্কার না হওয়ায় কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ীটি আজ প্রায় ধ্বংস হতে চলেছে। গতকাল শনিবার সকালে বাড়িটি দেখতে ঢাকা থেকে আসা মাহাফুজা বেগম কনা তার ছেলে মাহফুজুর রব্বানী তমালসহ তাদের সাথে থাকা অনেকেই বলেন, মোতাহার হোসেন খানের কর্মযজ্ঞের স্মৃতিকে আরও স্মরনীয় করে রাখতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় তার ধ্বংসাবশেষ বাড়ীটির অবকাঠামো ঠিক রেখে পরিকল্পিত এবং দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্রে পরিনত করতে খাঁন পরিবারের প্রতি আহবান জানান। এতে পর্যটকের সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি এলাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িটিও সুরক্ষা করা সম্ভব হবে। স্থানীয় বীরমুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম খান বাবু বলেন, এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা তার সম্পর্কে দাদা তিনি মারা যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বাড়ি সংস্কার করে পর্যটন এলাকা হিসাবে এই এলাকাকে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে বাড়ির সুন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে সুন্দর একটি পরিবেশের সৃষ্টি হবে। যাতে করে পর্যটক কেন্দ্র হিসাবে এলাকাটি গড়ে উঠতে পারে। স্থানীয় মেম্বার লিপটন খান বলেন, বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থা পড়ে আছে। ব্যক্তি মালিকানা কিংবা সরকারি ভাবে বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তুলতে পারলে। এই ভবন ঘিরে বিভিন্ন দোকান পাট গড়ে উঠবে। এছাড়াও এলাকার মানুষের আর্থিক কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি হবে। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন দিবস ও উৎসবে এই এলাকায় দুর দুড়ান্ত থেকে প্রচুর লোকের সমাগম ঘটে। বাড়িটি দেখাশোনার দায়িত্বরত স্থানীয় আক্কাস আলী বলেন, তিনি বাড়িটি দেখাশোনাসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকেন। এ ছাড়াও বাড়িটি দেখতে আসা মানুষদেরকে ঘুরে ঘুরে বাড়িটি দেখান। তিনি বলেন, বাড়িটি দীর্ঘদিন যাবত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সংস্কার করলে ভালো হতো। স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, গুনাহারের দারুণ দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো সাহেব বাড়িটি বৃটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী একটি ভবন। এই বাড়ির চারপাশে নান্দনিক দৃশ্য এখানে লুকায়িত রয়েছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জমির মালিকগণ পারস্পারিক আলোচনার মাধ্যমে এটি একটি পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তুলতে পারেন। তাহলে এই এলাকাটি পরিচিতির পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় পরিণত হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন জিহাদী বলেন, গুনাহারের জমিদার বাড়ি বা সাহেব বাড়ির স্থাপত্য আছে যা লোকে সাহেব বাড়ি বা জমিদার বাড়ি বলেই জানেন। তিনি যতদুর খোঁজ নিয়ে জেনেছেন এই বাড়িটি ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি। মালিক বা মালিকের বংশধররা এখনো জীবিত আছেন। তারা মাঝে মধ্যেই এখানে আসেন এবং বাড়িটি দেখাশোনার পাশাপাশি খোজ খবর নেন। একটি বড় প্রাচীণ অবকাঠামো যা দেখতে অনেক দুর দুরান্ত থেকে লোকজন আসেন। ঘুরে ফিরে দেখেন ছবি তোলেন অনেকেই মনে করেন এটি একটি প্রাচীন বাড়ি যা পরিত্যক্ত। মানুষদের মধ্যে ধারণা হয়তো এটি পর্যটন স্থান হিসাবে গড়ে তোলা যেতে পারে। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি মালিকানায় অনেক পার্ক পর্যটন এলাকা গড়ে উঠছে। এখানেও জমির বংশধর বা মালিকরা চাইলে এই বাড়ি এলাকায় একটি পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তুলতে পারেন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তিনি সার্বিক সহযোগিতা করবেন।